অভিজ্ঞ সাংবাদিক শ্যামল রায়ের কলমে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

0
36

শ্যামল রায়,নয়াজামানা:-দীর্ঘ কয়েক বছরের অভিজ্ঞ সাংবাদিক শ্যামল রায়ের কলমে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।নীচে তাঁর পুরো লেখা দেওয়া হল…. বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম সর্বজনবিদিত। একদিকে রবি ঠাকুর যেমন বিশ্বকবি, অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি। একে অপরের পরিপূরক দুই কবিকে আমরা কখনো ভুলে থাকতে পারবো না। স্মরণে মননে সব সময় হৃদয় জুড়ে দুই কবি যেন পরস্পর সমান্তরাল ভাবে আমাদের চোখের সামনে দন্ডায়মান। কারণ আজকের আলোচনায় আমরা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বলছি অনেক আগে থেকেই তিনি কিন্তু নারীবাদীর প্রথম পুরোহিত ছিলেন।সমাজে সংসারে নারীর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং যত্নশীল স্পর্শকাতর’ একটি বিষয়। নারীকে মনে রাখা নারীকে ভালোবাসা আর নারীর ঐকান্তিক আন্তরিকতায় যদি আন্দোলন সংগঠিত হয় সে ক্ষেত্রে তার পরিসর এবং সুদুরপ্রসারী একটা ভূমিকা নিতে পারে বর্তমান সময়ে আমরা কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে দেখে যাচ্ছি। স্বাধীন ভারতের জন্য নারীর ভূমিকা এখনও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে মাতঙ্গিনী হাজরা থেকে শুরু করে কাদম্বিনী পর্যন্ত নারীর কথা আমরা কখনো ভুলব না। বর্তমান আমরা দেখতে পাচ্ছি নারীর ভূমিকা আরো যথেষ্ট যত্নশীল এবং বিকল্প একটা ব্যবস্থার মধ্যে দ্রুত উঠে আসছেন নারী। তাই বিদ্রোহী কবি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে লিখেছিলেন সাম্যের গান গাই—- আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নেই। বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী। অর্ধেক তার নর। অর্থাৎ একদিকে নারী অন্যদিকে পুরুষ। কিন্তু এখন ক্রমশ নারীদের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলা ভাষায় শুধু নয় সমগ্র নারীবাদী চিন্তা-চেতনার মূল থিম বা ম্যানিফেস্টো বলা যায়। নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম বীজটি যেন নজরুলের হাত ধরে অঙ্কুরিত হয়েছিল। জানা গিয়েছে যে ভার্জিনিয়া উলফ বা সিমোন দ্য বোভোয়ার এর সেকেন্ড সেক্স এর অনেক আগে নজরুল এমন মানবিক ও জুড়ালো আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দাবি তুলেছিলেন নারীদের হয়ে। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় নারীকে শুধু অধিকারের ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া নয় সম-অধিকার দেওয়ার কথা নজরুলই প্রথম বলেছিলেন চিৎকার কন্ঠে। নারীবাদী আন্দোলন কে সিমোন দ্য বোভোয়ার আরো প্রসারিত করেছিলেন জা পল এর সহযোগিতায় সে কথা অবশ্য স্বীকার্য। কিন্তু নজরুল এই আন্দোলনের পুরোধা বা প্রথম সার্থক পুরোহিত ছিলেন এ কথা আজ আরও জোর দিয়ে বলতে পারছি আমরা। নজরুলের চিন্তা-চেতনার আধুনিকতা ছিল সর্বাংশে। আর এই আধুনিকতা ছিল বলেই তার মধ্যে ছিল না কোন মৌলবাদের বীজ। নজরুল ছিলেন এক উদার মানসিকতার পথিক। উনবিংশ শতকের গোঁড়ামি রক্ষণশীলতা থেকে তিনি সমাজকে মুক্ত করতে ছিলেন অঙ্গীকারবদ্ধ। আজকে এই সময়ে স্মরণ করতে আমাদের দ্বিধা নেই যে নজরুলের কবিতায় গানে নারীদের সামাজিক অধিকার পরিবর্তনের জন্য সারা জীবন এক জেহাদ ঘোষণা করে গেছেন। তার সাম্যবাদী চিন্তাধারার ফলে তার মনের বিকাশ ঘটেছে হৃদয়ের উদারতা আকাশের মতো ব্যাপক গভীরতা পেয়েছে। সমাজবাদী ভাবনায় নিজের মন কে তৈরি করেছিলেন বলেই নারীদের নিয়ে এমন গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে পেরেছিলেন তিনি। নজরুল তার নারী কবিতায় নারী পুরুষের যেসাম্য গান গাইলেন তা বাংলা সাহিত্যে শুধু নয় গোটা ভারতে এমনকি বিশ্বের কাছেও অভিনব এক পথ দেখিয়েছিলেন এই নজরুল ইসলাম। নারীদের এমন গভীর সম্মান এবং এমন অধিকারবোধ নিয়ে এর আগে কেউ এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন বলে মনে হয় না। তিনি বাংলা ভাষায় প্রথম উচ্চারণ করলেন অধিকারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান সমান। নজরুলের মধ্যে চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল যে নারী-পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই এক মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারীসমাজ অনেকটাই এগিয়ে চলছে আমাদের সকলের জন্য। বিদ্রোহী কবি নজরুল ছিলেন বিশ শতকের প্রথমার্ধের কবি ও শিল্পী। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের জন্মদিন । জন্মেছিলেন ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামে। মৃত্যু হয়েছিল আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশের ঢাকায় ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ সালে। নজরুলের লেখালেখির ক্ষেত্রে কবিতার প্রথমেই নারীবাদী চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল স্বাভাবিকভাবেই। তিনি জন্মগ্রহণ করার আগে কখনো এই ধরনের নারীবাদী আন্দোলনের কথা কেউ বললেও সে রকম দানা বাঁধেনি কিন্তু নারীদের সমস্যা নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন জোরালোভাবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাই আমরা চিন্তা চেতনার প্রথম পুরোহিত বলতে পারি। নারীবাদী নিয়ে সমালোচক সিমোন দ্য বোভোয়ার কে এই পথের প্রথম পথিকৃৎ বলে মনে হলেও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ছিলেন নারীবাদী নিয়ে লেখনীর সৃষ্টিকর্তা। মানবিক একটা দিক আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাস্তবে নজরুলের কাব্যে প্রথম প্রকাশিত হয় নারীবাদী নিয়ে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা চিরকাল অসহায় এবং অবহেলিত বঞ্চিত ছিলেন। মহিলাদের ভূমিকা ছিল অনেকটা পরজীবীর মত। সামাজিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই কাঠামোগত কিছুটা পরিবর্তন হলেও মূল ব্যাপারটা কোন পরিবর্তন আমরা দেখতে পায়নি এখন কিন্তু নারীদের মধ্যে সমস্ত কিছুর পরিবর্তন মুখি উন্নয়নমুখী একটা আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে এবং নারীর ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংঘটিত আন্দোলন সমাজ চেতনার ফসল হিসাবে আমরা ধরে নিতে পারি। তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিগত দিনে চিন্তাভাবনা আজ যেন গুরুত্ব বাড়ছে। শুধু ভারতবর্ষে নয় বিশ্বজুড়ে নারীর ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে উঠছে। নারীদের সমস্যা শুধু আমাদের দেশের সমস্যা নাই এটা গোটা দুনিয়ার এক চরম সমস্যা তবুও কিন্তু নারী আজ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেতে চলছেন নারীরা। অনেক সময় নারীদের পুরুষের কাছে ভোগ-বিলাসী যৌন ক্ষুধা নিবারণ করতে চিন্তাভাবনার প্রকাশ পুরুষরা ভাবলেও আজ কিন্তু পরিবর্তনশীল এবং উন্নয়নমুখী নারীরা। তবে অনেক ক্ষেত্রে সমালোচনার ঝড় ওঠে নারীদের ক্ষেত্রে নারীদের একটা অংশ চিন্তা চেতনার দিক থেকে পিছিয়ে আছেন। নারী অন্য নারীকে ক্ষতি করার প্রবণতা কিছুটা হলেও উঁকিঝুঁকি মারে। তবুও এইসব উপেক্ষা করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আজ আমরা স্মরণ করতে পারি নারীবাদী চিন্তা-চেতনার প্রথম পুরোহিত একজন পথপ্রদর্শক শিল্পী ও লেখক। নজরুল সব সময় চেয়েছেন বলেছেন জাতি-ধর্ম জাতপাত ধনী-দরিদ্র সাদাকালো ও নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে হবে আমাদেরকে। তাহলেই গড়ে উঠবে একটি সুন্দর পৃথিবী সুন্দর সমাজ। তাই এখনও নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা আমাদের কাছে যথেষ্ট রয়েছে। আমরা দেখেছি নজরুল ৪৩ বছরের জীবনে ও সক্রিয় জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নজরুল নিজেকে দেশ ও দশের কাজে উৎসর্গ করেছেন। তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছিলেন তার পিছনে মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ এর যুদ্ধ বিদ্যা শিখে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অংশ নেওয়া অত্যাচারী ইংরেজ কে দেশ থেকে তাড়ানো। তাই একের পর এক কবিতা ও গল্প লিখে মানুষকে সচেতন ও তার বার্তা দেওয়ার কাজ করে গেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল শ্রমিক কৃষক ও মেহনতী মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অজস্র লেখা লিখেছেন। যাত্রা গান লিখেছেন নাটক লিখেছেন আর সাধারণ মানুষকে তিনি সম্মান দিয়েছেন। একটু স্মরণ করতে হয় যে নদীয়ার হুকুম চাঁদ জুট মিলে তিনি ধর্মঘটী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে ধর্মঘটের সমর্থনে ধরনায় বসে ছিলেন হারমোনিয়াম কাঁধে নিয়ে গান গেয়েছিলেন হাজারো ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি মাদারীপুরে জনজাগরণকারি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এবং তারকেশ্বর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে চারণকবি ভূমিকা নিয়ে তিনি জ্বালাময়ী গান লিখে মানুষকে সংগ্রাম আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। বলতে দ্বিধা নেই বিদ্রোহী কবি দেশাত্মবোধক তার ভূমিকা ছিল যথেষ্ট। এই লেখাটির মধ্যে একদিকে নারীবাদী চিন্তাভাবনার ফসল বুনন করা অন্যদিকে স্বাধীন আন্দোলনের কথা দেশাত্মবোধের কথা তিনি বলেছেন লিখেছেন। নজরুল সঠিক পথের দিশা দেখিয়ে দেশকে সাম্রাজ্যবাদের বাঁধন থেকে মুক্ত করতে চেয়ে ছিলেন তাই লিখেছিলেন হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোনজন/ কান্ডারি বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার। জাত ধর্ম ভুলে সকলকে মানুষ বলে মনে করা ও সরল হৃদয়ে পরস্পরের সঙ্গে মিশতে পারা এক বড় বোন চির বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল এর মধ্যে সেই গুন আত্মস্থ করতে না পারলে আমরা সম্প্রীতির উদাহরণ সৃষ্টি করবো কিভাবে প্রশ্ন উঠেছে আজ। পরিশেষে বলতে হয় আজ আমরা যখন নতুন করে ধর্ম নিয়ে মাতামাতি শুরু করছি আর ধর্মকে মানবতার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে চাইছি বিড়ম্বিত সেই সময় আমাদের মনে রাখতে হবে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ,রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন ফকির ,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, কাজী নজরুল ইসলাম তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন। তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের উপহার দিয়েছেন সংস্কারমুক্ত একমন ও প্রগতিশীল মানব ভাবনা যার উত্তরাধিকার বহন করতে না পারলে ইতিহাস নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষমা করবে না।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here